আপনারা আমার সন্তানকে ফিরিয়ে দিন

দেবীদ্বারে অভাবে পড়ে ৫মাসের সন্তান বিক্রয় করার অভিযোগ! বিভিন্ন ধাপে বিক্রয় হওয়া বাচ্চা গ্রহীতার ঠিকানা জানা নেই কারোর

আপনারা আমার সন্তানকে ফিরিয়ে দিন। আমার স্বামী দালালের মাধ্যমে আমার সন্তানকে আড়াই লক্ষ টাকায় বিক্রয় করে দিয়েছে। সাংবদিক দেখে এমনই বুকফাটা আর্তনাদে আকুতি জানালেন এক সন্তান হারা মা’। ঘটনাটি ঘটে কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার জাফরগঞ্জ ইউনিয়র’র বারুর গ্রামের পূর্বপাড়া মূন্সী বাড়িতে।

উপজেলার বারুর গ্রামের মনু মিয়ার পুত্র দরিদ্র মোঃ সেলিম মিয়া(৪৫) অভাবের তাড়নায় তার ৫মাস বয়সী ‘ইয়াছিন’ নামে এক পুত্র সন্তানকে স্থানীয় এক দালালের মাধ্যমে দু’লক্ষ পঞ্চান্ন হাজার টাকায় বিক্রি করে দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। সোমবার সকালে সরেজমিনে ওই বাড়িতে যেয়ে ঘটনার সত্যতা জানা যায়। তবে এক্ষেতে স্বামী- স্ত্রীর কথা বলার সময় পরস্পর বিরোধী বক্তব্য পাওয়া যায়।

সন্তান হারা বিলকিস বেগম(৩৫) জানান, গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় একটি মাইক্রোবাস যোগে কয়েকজন লোক এসে কোল থেকে জোরপূর্বক ছিনিয়ে নিয়ে আমার বুক খালি করে দিয়ে যায়। আমি অনেক আকুতি মিনতি করেও সন্তানকে আগলে রাখতে পারিনি। সন্তান দিতে না চাইলে, আমার স্বামী আমাকে বেধরক মারধর করে সন্তানকে ছিনিয়ে নিয়ে ওদের হাতে তুলে দেয়। শোনেছি আমার স্বামী চরবাকর গ্রামের বলিমন্দের বাড়ির নূরুল ইসলাম’র মাধ্যমে দুই লক্ষ পঞ্চান্ন হাজার টাকায় আমার সন্তানকে বিক্রয় করে দিয়েছে। সন্তানকে কোথায় বিক্রি করেছে জানিনা। আমার স্বামী জুয়ারী, জুয়া খেলে এখন প্রায় সর্বশান্ত। তাই অভাবের তাড়নায় আমার সন্তান বিক্রয় করেছে। যে কোন কিছুর বিনিময়ে হলেও আমি আমার সন্তান ফিরে চাই।

তবে বিলকিসের স্বামী সেলিম মিয়া(৪৫) বলছেন অভাবের সংসার, স্ত্রী, ৫ পুত্র ১ কণ্যা নিয়ে সংসারের ভরনপোষণ পরিচালনায় খুবই কষ্ট হচ্ছে। চরবাকর গ্রামের ব্যবসায়ি নূরুল ইসলাম আমার সন্তানকে কুমিল্লায় এক নিঃসন্তান পরিবারের নিকট দত্তক হিসেবে দিয়েছেন। তবে আমি কোন টাকা পয়সা নিয়ে সন্তানকে বিক্রি করিনি, দত্তক হিসেবে দিয়েছি। আমার সন্তান ভালো থাকবে, লেখা পড়া শিখবে, মানুষের মতো মানুষ হবে। এজন্যই দত্তক দিয়েছি। নূরুল ইসলাম আমার সন্তানকে কোথায়, কারকাছে েিয়ছে তার ঠিকানা আমার জানা নেই।

বাচ্চা বিক্রয়ে সহায়তাকারী চরবাকর গ্রামের ব্যবসায়ি নূরুল ইসলাম কোথায় সন্তান দিয়েছে জানতে চাইলে সে জানায়, সন্তান বিক্রয় করা হয়নি, অভাবের কারনে পরিবারের সম্মতি নিয়েই কুমিল্লায় এক নিঃসন্তান শিক্ষক পরিবারের নিকট দত্তক দিয়েছি। তবে ওই পরিবারের পরিচয় সে জানেনা, এমনকি নামও জানেনা, তবে একটি সেল ফোন নম্বর দিয়ে বলেন, পরিচয় বলতে এটাই আছে।

পরে ওই সেল ফোনে যোগাযোগ করে জানা যায় ভিন্ন কথা। পরিচয় জানতে চাইলে তিনি প্রথমে বলেন, আমি এ বিষয় কিছুই জানিনা, আমি কোন সন্তান নেইনি, যারা নিয়েছে তাদের সাথে যোগাযোগ করুন। কথোপকথনের এক পর্যায়ে তার নাম শামিম আহমেদ, পেশায় শিক্ষক বলে জানান। তিনি আরো বলেন তার কোন সন্তান নেই। একটি সন্তানের খোঁজে আছেন অনেক দিন। তাই তার এক ছাত্র একটি সন্তানের খোঁজ দেন। পরে ওই ছাত্র তার মায়ের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেয়। তার মা’ও তার ভাই দেবীদ্বার উপজেলার চরবাকর গ্রামের নুরুল ইসলামের সাথে যোগাােগ করতে বলেন। নুরুল ইসলাম ওই শিশুটির সন্ধান দেন এবং বাচ্চা নিতে হলে ২লক্ষ ৫০হাজার টাকা দিতে হবে বলে জানান। এতো টাকা দিয়ে বাচ্চা কেনার সামর্থ আমার ছিলনা। পরে আরো একটি ধনাঢ্য নিঃসন্তান পরিবারের বাচ্চার প্রয়োজন হওয়ায় এবং তিনি একটি বাচ্চা অনেক দিন ধরেই খুঁজছেন। ওই পরিবারের সাথে যোগাযোগ করি। ওরা গত ১৬মার্চ বারুর গ্রামে এসে বাচ্চা দেখে পছন্দ করেন এবং কথাবাতা শেষে গত ২৯ মার্চ ৩শত টাকার নন জুডিশিয়াল ষ্ট্যাম্পের মাধ্যমে কিছু শর্তস্বাপেক্ষে (শর্তগুলোর মধ্যে এ বাচ্চা আর কখনো দাবী করতে পারবেনা, তার খোঁজ খবরও নিতে পারবেনা উল্লেখযোগ্য) ৩ জন স্বাক্ষীর স্বাক্ষর নিয়ে ২লক্ষ ৫৫হাজার টাকা পরিশোধ করে বাচ্চা নিয়ে যায়। তবে তিনি ওই পরিবারের পরিচয় দিতে অপারগতা জানান, এক পর্যায়ে বাচ্চা গ্রহীতার নাম মঞ্জু, চট্রগ্রামে অডিটর হিসেবে কর্মরত আছেন বলে জানান। তিনি আরো বলেন, বাচ্চাটি ভালো থাকবে, ওই পরিবার বিশাল সম্পদের মালিক। ভবিষ্যতে সব কিছুরই মালিক হবে ওই শিশুটি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই বাড়ির কয়েকজন মহিলা জানান, বাচ্চা বিক্রয় করে দেয়ার সংবাদ পেয়ে আমরা বাচ্চাটিকে লোকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছি, পারিনি। তাদের পরিবারের সবাই চট্রগ্রাম থাকত। চট্রগ্রামে থেকে সেলিমও ভ্যান চালাত। ওখানেই লক্ষীপুর জেলা সদরের ফয়জুর রহমান’র সাথে পরিচয় এবং তার মেয়ে বিলকিস বেগমের সাথে সেলিমের বিয়ে হয়। বিয়ের পর প্রায় ২২বছর ধরে সেলিম মিয়া দেশের বাড়িতেই থাকেন। এসময়ে ৫ছেলে ও ১কণ্যা সন্তানের জন্ম দেন। বড় ছেলে মোঃ সবুজ(২০) গ্রামের বাড়িতে থেকে সিএনজি চালায়, আকাশ(১৭) চট্রগ্রামে দাদা-দাদী-চাচার সাথে থেকে সিএনজি চালায়, সাগর(১৪) স্থানীয় একটি দোকানে কর্মচারি হিসেবে আছে, চতুর্থ ছেলে সাওন(৯) এবং এক মাত্র মেয়ে সাথী(১২) স্থানীয় বারুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ে। আর সর্বশেষ পঞ্চম পুত্র ইয়াছিনকে বিক্রয় করে দেয়া হয়। তারা আরো জানান, বারুর এবং পোনরা গ্রামে বড় বড় জুয়ার আসর বসে সেলিমও পাক্কা জুয়ারী আয়ের অধিকাংশ টাকাই জুয়া খেলে শেষ করে। জুয়ায় অনেক টাকা ঋণী হয়ে গেছে। আজ কয়েকদিন হয় বাচ্চা বিক্রির টাকা দিয়ে একটি মুদী দোকানী ব্যবসা চালু করেছে। ওরা আরো বলেন, বাচ্চা বিক্রয় করারয সন্দেহ বেশী, কারন শোনেছি বাচ্ছার অঙ্গপতঙ্গ বিক্রি হয়। দত্তক নিলে প্রমান থাকে।

দত্তক দেয়া প্রসঙ্গে কুমিল্লা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারন সম্পাদক এডভোকেট সৈয়দ নূরুর রহমান বলেন, মুসলিম আইনে দত্তকের কোন বৈধতা নেই। অনেকে হলফনামায় এফিডেফিট করে বৈধতার সুযোগ,নিলেও মুসলিম আনে তারও কোন ভিত্তি নেই।

এব্যপারে দেবীদ্বার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রবীন্দ্র চাকমার সাথে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, এ বিষয়ে কেউ অভিযোগ করেনি, তবে এখন যেহেতু বিষয়টা শোনেছি তদন্ত স্বাপেক্ষে বাচ্চা উদ্ধার সহ আইনগত ব্যবস্থা নেব।

এবিএম আতিকুর রহমান বাশার

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*